সাবমেরিন ক্যাবল কি? 

FB_IMG_1651121506463.jpg

সাবমেরিন ক্যাবল বলতে একটি ভিন্নধর্মী টেলিযোগাযোগ মাধ্যম কে বুঝানো হয়। সাধারণ ভাবে আমরা জানি যে, রেডিও ট্রান্সমিশনে ইথারে ছুঁড়ে দেয়া তথ্য আয়নোস্ফিয়ারে ঠিকরে আবার আমাদের কাছে ফিরে আসে। এই পদ্ধতিতে রেডিওর মাধ্যমে খবর বা সংগীত সম্প্রচার সম্ভব হলেও বৈরী আবহাওয়ায় বা দূর্যোগকালীন সময়ে এমনকি আপদকালীন সময়েও অধিকতর তথ্য আদান প্রদানের জন্য দ্রুত মাধ্যম হিসাবে “তার” বা “টেলিগ্রাফ” পদ্ধতি অপেক্ষাকৃত বেশি উপযোগী। স্বাভাবিক ভাবে একটি দেশ বা জনপদে টেলিগ্রাফ এর ব্যবস্থা সহজেই করা সম্ভব খুঁটি গেড়ে বা মাটির নিচে টানেল করে। কিন্তু, বিশাল দূরত্ব যেমন এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে? সেখানে তো আর খুঁটি বসিয়ে নেয়া সম্ভব নাও হতে পারে! সে কারণেই , এই কাজটি করবার জন্য সাগরের গভীরে তার বসিয়ে বা ক্যাবল বসিয়ে বা ভাসিয়ে নেয়া হয়। বেশি গভীরতার সাথে তুলনা করতে গিয়েই ঐ গভীরতার যানবাহণ সাবমেরিনের তুলনায় এই ক্যাবলের নাম-ও হয়ে গেছে সাবমেরিন ক্যাবল।

সাবমেরিন ক্যাবল কবে প্রথম ব্যবহার হয়?

প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল কিন্তু সাম্প্রতিক কোন ঘটনা নয়। সেই ১৮৫০ সালে প্রথম বাণিজ্যিক সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন হয় এংলো ফ্রেন্চ টেলিগ্রাফ কোম্পানির তদারকি তে। সেটিই প্রথম ব্রিটিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়া যান্ত্রিক যোগাযোগ মাধ্যম। ভারতীয় উপমহাদেশে ১৮৬৩ সালে সাবমেরিন ক্যাবলের সাহায্যে সৌদি আরবের সাথে বোম্বের প্রথম যোগাযোগ স্থাপন হয়। এর ৭ বছর পর, লন্ডনের সাথে বোম্বের সরাসরি সংযোগ দেয়া হয়।

সাবমেরিন ক্যাবল কতটা দূর্বল বা সবল?

স্থিতিস্থাপকতা যে কোন তার বা পরিবাহকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয়, সেই সাথে সেটি কোন মাধ্যমে স্থাপিত হবে এবং মাধ্যম ভেদে তার স্বভাবজাত পরিবর্তনের সম্ভাবনা , সব মিলিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মত একটা চমকপ্রদ জিনিস ঠিক কি ভাবে বানানো হয় সেটা জানতে চাইবার মত বিষয় বৈকি! অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, প্রথম যেই ক্যাবলটি ব্রিটিশ চ্যানেল পাড়ি দেয় সেটি কিন্তু কেবল একটা গ্যাটা-পার্চায় মোড়ানো কপার তার ছিলো। বিশেষ কোন অন্তরক বা ইনসুলেশন দেয়া হয় নাই! তবে কালের সাথে সাথে আমাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ঘটেছে এবং এখনকার সাবমেরিন ক্যাবলে মূলত অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করা হয় । অপটিক্যাল ফাইবারের চার পাশে বেশ কয়েক স্তরে থাকে বেশ কয়েক ধরণের অন্তরক এবং নিরাপত্তা বর্ধক স্তর।

সাবমেরিন ক্যাবল কি? বাংলাদেশ যদি একাধিক সাবমেরিন কেবলের সাথে যুক্ত হয় তাহলে কি ধরনের সুবিধা পাবে?

‘সাব’ মানে ‘নীচে’ আর ‘মেরিন’ মানে ‘সমুদ্র বিষয়ক’, “সাবমেরিন কেবল” মানে “সমুদ্রের নীচে অবস্থিত তার”। এটা শুরু হয়েছিল ইউরোপ-আমেরিকার মধ্যে টেলিগ্রাফের জন্যে তামার তার বসিয়ে, কিন্তু বর্তমান সময়ে “সাবমেরিন কেবল” বলতে শুধু “সমুদ্রের নীচে দিয়ে বসানো “অপটিক্যাল ফাইবার”কে বুঝায়”। . আগে তথ্য পাঠানোর জন্যে ‘তামার তারে’র মধ্যে ‘ইলেকট্রনিক সিগন্যাল’ পাঠানো হত। আমরা বাসায় রাউটার দিয়ে এখনো এটি ব্যবহার করি। কিন্তু ‘ইলেকট্রনিক সিগন্যালে’র থেকে, “আলো” দিয়ে অনেক অনেক বেশি তথ্য পাঠানো সম্ভব – “মডুলেশন” ব্যাবহার করে এটি করা হয়, আলোর প্রাকৃতিক ধর্মের জন্যে সম্ভব এটি। এটি অবশ্য স্বাভাবিক আলো না, এটি “লেজার আলো” – নিউমার্কেট/ফার্মগেটে ওভারব্রিজের নীচে এক ধরনের খেলনা পাওয়া যায় “লেজার আলো” দিয়ে, অন্ধকারে বিভিন্ন রকম নকশা ফেলা যায় দেয়ালের উপর । এই “লেজার আলো” পরিবহন করে “অপটিক্যাল ফাইবার”। তাই দুটি দেশের মধ্যে বেশি বেশি তথ্য আদান-প্রদানের জন্যে সবচেয়ে কম খরচের উপায় হবে, যদি দেশ দুটির মধ্যে “অপটিক্যাল ফাইবার” বসানো যায়। রাজনৈতিক, নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত গত কারনে এই “অপটিক্যাল ফাইবার” স্থল পথের উপর দিয়ে না নিয়ে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নেয়া হয়, সমুদ্রের নিচের এই “অপটিক্যাল ফাইবার”কে “সাবমেরিন কেবল” বলে। . যত বেশি “সাবমেরিন কেবল” তত বেশি তথ্য আদান-প্রদানের দ্রুতি বা বেশি বেশি লোককে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া সম্ভব। তাই বাংলাদেশের জন্যে আরেকটি সাবমেরিন কেবল মানে ইন্টারনেটের দ্রুতি অনেক বেড়ে যাবে। আরেকটি সমস্যা – সমুদ্রের নীচে “কন্টিনেন্টাল ড্রিফট” বা “মহাদেশীয় সম্প্রসারণ” এর জন্যে সমুদ্রের নীচের এই কেবল প্রায়ই কেটে/ছিঁড়ে যায় – ইন্দোনেশিয়ার কাছাকাছি এই রকম একটা সম্প্রসারণ হয় এবং আমাদের বর্তমান কেবল ইন্দোনেশিয়ার কাছ দিয়ে গিয়েছে। তাই আরেকটি কেবল হলে বাংলাদেশের ব্যাকআপ কেবল থাকবে, পুরোপুরি ইন্টারনেট বিহীন অবস্থায় থাকার সম্ভাবনা কমে যাবে ।

বাংলাদেশ প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ সি-মি-উই ৪ পায় ২০০৬ সালে। ইতিমধ্যে তার জীবন অর্ধের গড়িয়েছে। তাই ২০২৫ সালের মধ্যেই আরেকটি ক্যাবলের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ভারতের রয়েছে ৮টি সংযোগ, পাকিস্তানের ৪টি এবং শ্রীলঙ্কার ৪টি।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। এতে বাড়তি ১৫০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ পাবে বাংলাদেশ।

দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দেশের আইসিটি খাতে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে এবং সব সংকট মিটিয়ে অতিরিক্ত ব্যান্ডউইডথ বিদেশে রপ্তানি করা যাবে বলে মনে করেন আইটি বিশেষজ্ঞরা।

১ম সাবমেরিন ক্যাবলটি কোনো কারণে বিচ্ছিন্ন হলে তার বিকল্প হিসেবে কাজ করবে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল।

তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল নিয়েও ভাবছে বাংলাদেশ।

তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকতে চায় না। দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যত চাহিদার কথা ভেবে বাংলাদেশ তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করবে। ইতিমধ্যে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়ার কারণগুলোও সরকারের কাছে ব্যাখ্যা করেছেন।

তবে অর্থ বিনিয়োগ না করে ব্যান্ডউইথ আদান-প্রদানের মাধ্যমে এ ক্যাবলে যুক্ত হবার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এগিয়ে যেতে চাইছে সরকার।

সূত্র জানিয়েছে, হুয়াও মেরিন নামে একটি কোম্পানি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার আগ্রহী দেশগুলোকে এক সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্যাবলের রুট বঙ্গোপসাগর দিয়ে অতিক্রম করবে। প্রাথমিকভাবে বলা হচ্ছে, এটা চীন থেকে মিয়ানমার হয়ে ভারত কিংবা শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত যাবে। তাই এ কনসোর্টিয়ামে যোগ দেয়ার বিষয়ে বিএসসিসিএল পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি চেয়েছে।

সংকলনে : Misbahul Kabir

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top